মোদির পতন হয় না কেন? মোদির ক্ষমতার রহস্য কি?

নরেন্দ্র মোদির ক্ষমতায় টিকে থাকার রহস্য ও ভারতের রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে বিশ্লেষণধর্মী থাম্বনেইল ojanatottho
নরেন্দ্র মোদির দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকে থাকার পেছনে রাজনৈতিক কৌশল, জাতীয়তাবাদ, উন্নয়ন ও বিতর্ক—সবকিছু নিয়েই এই বিশ্লেষণ।


ভারতের রাজনীতিতে নরেন্দ্র মোদি একটি অত্যন্ত আলোচিত ও বিতর্কিত নাম। একদিকে তিনি বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দেশের দীর্ঘদিনের ক্ষমতাসীন নেতা, অন্যদিকে তার রাজনীতি, কৌশল ও সিদ্ধান্ত নিয়ে রয়েছে তীব্র বিতর্ক। একজন চা বিক্রেতার ছেলে থেকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠার এই যাত্রা যেমন অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার গল্প, তেমনি সমালোচকদের কাছে এটি ক্ষমতা ধরে রাখার এক জটিল রাজনৈতিক কৌশলের উদাহরণ। নরেন্দ্র মোদির উত্থান, বিতর্ক এবং ক্ষমতায় টিকে থাকার বাস্তবতা নিয়েই আজকের এই বিশ্লেষণ। ভারতের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ভোটে জেতা নেতা কে? নেহেরু, না ইন্দিরা গান্ধী, না অটল বিহারী বাজপেয়ী? তিনিও না। উত্তর হলো নরেন্দ্র মোদি। একজন মানুষ যার বাবার চায়ের দোকান ছিল। যে ছেলেটা ছোটবেলায় রেল স্টেশনে চা বিক্রি করত, সে একদিন ১৫০ কোটি মানুষের প্রধানমন্ত্রী হলো। প্রাইম মিনিস্টার শ্রী নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি। 

এই গল্পটা আমরা কমবেশি সবাই জানি। কিন্তু এটা শুধু রাজনীতির গল্প না। এটা বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এক যুগ ধরে ক্ষমতা ধরে রাখার রহস্যের গল্প। কারণ এই মানুষটাকে ঘিরে একই সাথে দুটো সত্য বিদ্যমান। একদল মানুষ তাকে ঈশ্বরের দূত মনে করে, আরেকদল সমালোচক তাকে ইতিহাসের সবচেয়ে বিপদজনক নেতা মনে করে। 

তাহলে সত্যিটা কী? একজন মোদি কী এমন করলেন, যার জন্য আমেরিকার মাটিতে, আমেরিকার স্টেডিয়ামে হাজার হাজার মানুষ “মোদি মোদি” বলে উল্লাস করেছে? জো বাইডেন তাকে জড়িয়ে ধরেছেন কংগ্রেসে। মিডিয়া যেভাবে তাকে মহামানবের মতো উপস্থাপন করে, আদৌ কি তিনি ততটা প্রশংসার যোগ্য? ভারতের মতো বিশাল রাষ্ট্রে এক যুগ ধরে ক্ষমতা ধরে রাখার সিক্রেটটাই বাকি। আজকে সেই সত্যটাই খুঁজবো আমরা। 

আমাদের আজকের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো আসামির নাম নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি। পেশা—ভারতের প্রধানমন্ত্রী। বিশ্লেষণ করব, নরেন্দ্র মোদি কীভাবে তার ক্ষমতা ধরে রাখছেন। 

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০০২। গোধরা স্টেশনে সাবরমতী এক্সপ্রেসের এস-৬ কোচে আগুন লাগল। মারা গেল ৫৯ জন করসেবক। ঘটনাটা ছিল ট্র্যাজিক। কিন্তু এরপর যা হলো, সেটা আর শুধু ট্র্যাজেডি ছিল না। সেটা ছিল ঠান্ডা মাথার পরিকল্পনার অভিযোগে ঘেরা এক সহিংসতা। 

পরদিন থেকেই শুরু হলো এমন কিছু, যেটাকে পরে একাধিক মানবাধিকার সংস্থা ও আইনজ্ঞ রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট পরিকল্পিত সহিংসতা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। মুসলিম বাড়িঘর আগে থেকেই চিহ্নিত করা ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে নারীরা চরম সহিংসতার শিকার হন। শিশুরাও রেহাই পায়নি এই বর্বরতা থেকে। সরকারি হিসেবেই ৭৯০ জন মুসলমান ও ২৫৪ জন হিন্দু নিহত হন। গবেষকদের মতে বাস্তব সংখ্যা আরও বেশি। 

এখন প্রশ্ন হলো, ওই সময়কার গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী মোদি কোথায় ছিলেন? 

২০০৭ সালে ভারতের বিখ্যাত অনুসন্ধানী সাময়িকী তেহেলকা একটি ছয় মাসব্যাপী স্টিং অপারেশন চালায়। নাম ছিল “অপারেশন কালাঙ্ক”। রিপোর্টার নিজেকে হিন্দুত্ববাদী বই লেখক হিসেবে পরিচয় দিয়ে দাঙ্গায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের সাথে কথা বলেন। ক্যামেরায় ধরা পড়ে ভয়াবহ স্বীকারোক্তি।

সেই স্টিং অপারেশনে দাবি করা হয়, পুলিশকে নাকি নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল হাত গুটিয়ে বসে থাকতে। দাঙ্গা থামানো হয়নি—বা থামতে দেওয়া হয়নি। 

তবে সুপ্রিম কোর্ট মামলাটি তদন্ত করে। তেহেলকার স্টিং অপারেশনে দাঙ্গায় অংশ নেওয়া কিছু ব্যক্তির বিভিন্ন দাবি ক্যামেরায় রেকর্ড হলেও সুপ্রিম কোর্টের তদন্তে সেই অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়নি এবং মোদিকে সরাসরি দায় থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। 

তবুও প্রশ্নটা থেকেই গেছে—প্রশাসনিক ব্যর্থতা ছিল, নাকি ইচ্ছাকৃত নিষ্ক্রিয়তা? 

আন্তর্জাতিক নিন্দার ঝড় ওঠে। আমেরিকা তার ভিসা বাতিল করে। ইউরোপও মুখ ফিরিয়ে নেয়। এরপর কী হলো? 

২০০৩ সালের নির্বাচনে মোদির ভূমিধস বিজয়ে আবারও তিনি মুখ্যমন্ত্রী হলেন। এখানেই বুঝতে হবে ভারতীয় রাজনীতির এক কঠিন বাস্তবতা—বিভাজন যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, সেটা বিশাল সংখ্যক ভোট এনে দেয়। মুসলিমদের বিরুদ্ধে হিন্দু ভোট একত্রিত হয়ে গেল। মোদি হয়ে উঠলেন “হিন্দু হৃদয় সম্রাট”—মানে হিন্দু হৃদয়ের রাজা। 

আরো অনেক বছর পেছনে যাওয়া যাক। 

১৯৫০ সাল, গুজরাটের ভাদনগর। এক গরিব পরিবারে জন্ম নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদির। বাবার চায়ের দোকানে ছোটবেলায় কাজ করতেন। 

কিন্তু এই গল্পটা মোদি নিজেই বারবার বলেন—নির্বাচনে বলেন, ইন্টারভিউতে বলেন, আবেগ নিয়ে বলেন। কেন? কারণ এই গল্পটাই তাকে ভারতের ৮০ কোটি গরিব মানুষের একজন হিসেবে তুলে ধরে। এটা তার প্রথম কৌশল—“আমি তোমাদেরই একজন।” 

তবে সমালোচকদের মতে বাস্তবে তিনি রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলেন। তিনি আরএসএসের সঙ্গে অল্প বয়সেই যুক্ত হন এবং সংগঠনের ভেতর থেকেই রাজনীতিতে উঠে আসেন। গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগেই তিনি দলীয় কাঠামোর ভেতর শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিলেন। 

মোদি সম্পর্কে আরেকটি বড় রহস্য হলো তার স্ত্রী যশোদাবেন। এই নামটা ভারতের বহু মানুষই জানেন না। ১৮ বছর বয়সে মোদির সাথে তার বিয়ে হয়েছিল। কিন্তু পরে মোদি আরএসএসের কাজে চলে যান এবং আর ফিরে আসেননি। যশোদাবেন একা জীবন কাটিয়েছেন, স্কুলে পড়িয়েছেন, সাধারণ জীবন যাপন করেছেন। 

২০১৪ সালে নির্বাচনী হলফনামায় মোদিকে প্রথমবার লিখতে হয় তিনি বিবাহিত। কারণ আইন অনুযায়ী মিথ্যা তথ্য দিলে প্রার্থিতা বাতিল হতে পারে। এর আগে তিনি নিজেকে অবিবাহিত বলতেন। 

এই ঘটনাটিও অনেকের মতে দেখায় যে মোদি সুবিধামতো সত্য প্রকাশ করেন। 

আরেকটি বড় রাজনৈতিক কৌশল দেখা যায় তার বক্তৃতায়। তার বক্তৃতায় সাধারণত দুটো বিষয় থাকে—প্রথমে একটি ভয়ের চিত্র তুলে ধরা, তারপর নিজেকে রক্ষাকর্তা হিসেবে উপস্থাপন করা। 

কখনও পাকিস্তান নিয়ে উত্তেজনা, কখনও জাতীয় নিরাপত্তা, কখনও সংখ্যালঘু ইস্যু—এসব নিয়ে এমন বক্তব্য আসে যা মানুষের মধ্যে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে। এরপর আসে প্রতিশ্রুতি—“আমি আছি, আমি রক্ষা করব, ভারত বিশ্বগুরু হবে।” 

মনোবিজ্ঞানের ভাষায় মানুষ ভয় পেলে যুক্তি হারিয়ে ফেলে। আর সেই ভয়ের মুহূর্তে যদি কেউ রক্ষাকর্তা হিসেবে সামনে আসে, মানুষ তাকে আঁকড়ে ধরে। 

এই ধারণাগুলো মানুষের মনে সবচেয়ে বেশি ছড়িয়ে দিচ্ছে ভারতের একটি বড় অংশের মিডিয়া—এমন অভিযোগও রয়েছে। 

একটি দেশে গণমাধ্যমের কাজ সত্য তুলে ধরা। কিন্তু সমালোচকদের মতে ভারতের বড় মিডিয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি বড় অংশ এখন কর্পোরেট মালিকানার অধীনে, যাদের মধ্যে মুকেশ আম্বানি ও গৌতম আদানির নাম প্রায়ই আলোচনায় আসে। 

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স–এর প্রেস ফ্রিডম ইনডেক্সে ভারত এখন অনেক নিচে নেমে গেছে। সমালোচকদের দাবি, যেসব সাংবাদিক সরকারকে প্রশ্ন করেন তাদের বিরুদ্ধে কখনও দেশদ্রোহ মামলা, কখনও তদন্ত শুরু হয়। 

ভারতে একটি নতুন শব্দ জনপ্রিয় হয়েছে—“গোদী মিডিয়া”। অর্থাৎ এমন মিডিয়া যারা ক্ষমতার খুব কাছাকাছি অবস্থান করে। 

গণমাধ্যমের পাশাপাশি বিরোধী দলগুলোর অবস্থাও বড় প্রশ্নের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারতের বড় বিরোধী দলের নেতা রাহুল গান্ধীকে এক মানহানি মামলায় দোষী সাব্যস্ত করে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল করা হয়েছিল। 

অরবিন্দ কেজরিওয়াল নির্বাচনের ঠিক আগে গ্রেপ্তার হন। হেমন্ত সরেন জেলে যান। মনীশ সিসোদিয়াও জেলে। 

সমালোচকদের মতে এখানে একটি প্যাটার্ন দেখা যায়—বিরোধী দলের প্রভাবশালী নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা ও তদন্ত। 

এখানে প্রায়ই তিনটি সংস্থার নাম আসে—সিবিআই (Central Bureau of Investigation), ইডি (Enforcement Directorate) এবং ইনকাম ট্যাক্স ডিপার্টমেন্ট। 

বিরোধীদের অভিযোগ, এই সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। তবে সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করে। 

ভারতের রাজনীতিতে একটি শব্দও জনপ্রিয় হয়েছে—“ওয়াশিং মেশিন পলিটিক্স”। অর্থাৎ কেউ যদি বিরোধী দলে থাকেন, তার বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। কিন্তু তিনি যদি ক্ষমতাসীন দলে যোগ দেন, তাহলে সেই মামলা অনেক সময় থেমে যায়—এমন অভিযোগ রয়েছে। 

উদাহরণ হিসেবে অজিত পাওয়ারের ঘটনা প্রায়ই আলোচনায় আসে। তার বিরুদ্ধে বড় দুর্নীতির অভিযোগ ছিল, কিন্তু পরে তিনি বিজেপির সঙ্গে জোটে গেলে রাজনৈতিক সমীকরণ বদলে যায়। 

এমন অনেক উদাহরণ নিয়ে ভারতের রাজনৈতিক বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। 

আরেকটি বড় বিষয় হলো জাতীয়তাবাদ ও নিরাপত্তা রাজনীতি। পাকিস্তানের সঙ্গে উত্তেজনা বাড়লে বা সীমান্তে সংঘাত হলে মোদির জনপ্রিয়তা বাড়ে—এমন বিশ্লেষণও আছে। সার্জিক্যাল স্ট্রাইক বা সামরিক অভিযানও রাজনৈতিক আলোচনায় বড় ভূমিকা রাখে। 

ধর্মীয় রাজনীতিও বড় একটি বিষয়। রাম মন্দির উদ্বোধন, তিন তালাক বাতিল, আর্টিকেল ৩৭০ বাতিল—এসব সিদ্ধান্তের সঙ্গে ধর্মীয় বা জাতীয় আবেগ জড়িত ছিল। 

সমালোচকদের মতে এগুলো রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়, আর সমর্থকদের মতে এগুলো ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত। 

তবে সবকিছুর মাঝেও কিছু বড় উন্নয়নমূলক কাজ অস্বীকার করা যায় না। 

উজ্জ্বলা যোজনার মাধ্যমে আট কোটির বেশি গরিব পরিবার রান্নার গ্যাস পেয়েছে। জনধন যোজনার মাধ্যমে কোটি কোটি মানুষ ব্যাংকিং ব্যবস্থার আওতায় এসেছে। কোভিড ভ্যাকসিনেশনের সময় ২০০ কোটিরও বেশি ডোজ দেওয়া হয়েছে, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভ্যাকসিন কর্মসূচিগুলোর একটি। 

ডিজিটাল ইন্ডিয়া ও ইউপিআই পেমেন্ট ব্যবস্থায় ভারত বিশ্বে অন্যতম এগিয়ে। অবকাঠামো—রাস্তা, রেল, বিমানবন্দর—গত দশ বছরে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে। 

তবে সমালোচকরা বলেন, একই সঙ্গে বেকারত্বও বেড়েছে এবং ধনী-গরিব বৈষম্যও বাড়ছে। 

২০২৪ সালের নির্বাচনে মোদি আশা করেছিলেন বড় জয় পাবেন। স্লোগান ছিল—“আবকি বার ৪০০ পার।” কিন্তু ফলাফলে দেখা যায় বিজেপি একা ২৪০টি আসন পেয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য দরকার ছিল ২৭২ 
 
ফলে প্রথমবারের মতো তাকে জোট সরকারের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে ভারতের মানুষ এতে একটি রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে। 

সব মিলিয়ে প্রশ্নটা থেকেই যায়—মোদি কীভাবে এত বছর ক্ষমতায় টিকে আছেন? উন্নয়ন, রাজনৈতিক কৌশল, জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় আবেগ—সবকিছুর মিশ্রণেই কি তৈরি হয়েছে এই জনপ্রিয়তা? 

এই প্রশ্নের উত্তরই এখনো খুঁজছে ভারতের রাজনীতি।

এই লেখাটি শুধুমাত্র তথ্য ও শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হয়েছে। এখানে প্রকাশিত মতামত কোনো ব্যক্তি, ধর্ম বা গোষ্ঠীকে আঘাত করার উদ্দেশ্যে নয়।

source: geyanchitro

*

إرسال تعليق (0)
أحدث أقدم