সনাতন ধর্ম ছেড়ে ইসলাম গ্রহণ কলেজছাত্রীর, আদালতে জানালেন আসল কারণ!

চাঁদপুরে বৈশাখী রানী পাল ইসলাম গ্রহণ করে জান্নাতুল ফেরদৌস নাম নেওয়ার পর আদালতে উপস্থিত ojanatottho
রমজান মাসে স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করে বৈশাখী রানী পাল নতুন নাম নিয়েছেন জান্নাতুল ফেরদৌস।


চাঁদপুর সরকারি কলেজের এক শিক্ষার্থীর ধর্ম পরিবর্তনের ঘটনা ঘিরে শুরু হয়েছে আলোচনা। বৈশাখী রানী পাল স্বেচ্ছায় ইসলাম গ্রহণ করে নতুন নাম নিয়েছেন জান্নাতুল ফেরদৌস এবং আদালতে হাজির হয়ে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান।

আমি স্বেচ্ছায় এ ধর্মে এসেছি। এখানে কারও প্ররোচনা ছিল না কিংবা কোনো প্রেমঘটিত বিষয়ও ছিল না। একান্তই আমি সত্যের সন্ধানে এখানে এসেছি।

পরিপূর্ণ পর্দা করে এক তরুণী হাজির হয়েছেন আদালতে। এমনকি সেখানে উপস্থিত ছিলেন তার বাবা-মাও। শুরুতে ঘটনাটি কী ঘটতে চলেছে তা হয়তো অনুমান করা মুশকিল ছিল। তবে সেই তরুণী যা জানিয়েছেন, তাতে হতবাক হয়ে যায় তার পরিবার। যে পরিচয়ে এতদিন আদরে বড় হয়েছেন পরিবারের কাছে, সেই পরিচয় বদলে অবশেষে এক নতুন পরিচয়ে বাঁচতে চান তিনি। আর তা শুরুতে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করলে মুহূর্তেই বিষয়টি ভাইরাল হয়ে যায়।

ইসলাম ধর্ম সত্য ধর্ম, শান্তির ধর্ম। আর সেই সত্যকে আঁকড়ে ধরেই বাকি জীবন কাটাতে চান কলেজছাত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস, যিনি কয়েকদিন আগেও ছিলেন সনাতন ধর্মাবলম্বী। তখন তার নাম ছিল বৈশাখী রানী পাল। তিনি জানিয়েছেন, কারও প্ররোচনায় নয়; বরং উচ্চমাধ্যমিকে পড়ার সময় থেকেই ধীরে ধীরে ইসলামের প্রতি তার আগ্রহ বাড়তে থাকে। তাই রোজার মাসেই সত্য ধর্মকে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

তবে তার এই সিদ্ধান্তে হতবাক হয়ে যান তার বাবা-মা এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। আর এ কারণে নিরাপত্তার আশঙ্কায় কয়েকদিন আত্মগোপনে ছিলেন তিনি। এদিকে বৈশাখীকে খুঁজে না পেয়ে দুশ্চিন্তায় পড়ে যায় তার পরিবার। ধারণা করা হয়েছিল প্রেমের টানে অথবা কারও প্ররোচনায় হয়তো এমনটি করেছে তাদের মেয়ে। পরে পরিবার জিডি করলে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে আদালতে হাজির করে। তখনই ঘটনাটি নতুন মোড় নেয়। অবশেষে আদালতে বৈশাখী তার বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে মুখ খোলেন।

পলাশ চন্দ্র পাল একটি সাধারণ ডায়েরি করেন তার বোন নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে। সেই জিডির প্রেক্ষিতে আমরা ভিকটিমকে উদ্ধারের চেষ্টা করি এবং পরে তাকে উদ্ধার করতে সক্ষম হই। ভিকটিমের কাছ থেকে জানতে পারি, সে হিন্দু সম্প্রদায়ের ছিল এবং পরে সে মুসলমান হয়েছে। কোর্টে এফিডেভিটের মাধ্যমে সে ধর্ম পরিবর্তন করেছে। আমরা তাকে উদ্ধার করে বিজ্ঞ আদালতে সোপর্দ করেছি। তাকে কার জিম্মায় দেওয়া হবে সে বিষয়ে আদালত সিদ্ধান্ত নেবে। যেহেতু সে ধর্ম পরিবর্তন করেছে, এ বিষয়ে আইনগত প্রক্রিয়াও অনুসরণ করা হচ্ছে। আদালত যে সিদ্ধান্ত দেবেন, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

চাঁদপুর সরকারি কলেজের অনার্স পড়ুয়া বৈশাখী জানিয়েছেন, তিনি কারও প্ররোচনায় বা প্রেমের টানে এমনটি করেননি। বরং নিজের আগ্রহ এবং ইসলামের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি এই ধর্ম গ্রহণ করেছেন। এমনকি তিনি বাবা-মার সঙ্গে নয়, বরং নিজ জিম্মায় থাকতে চান। এ সময় আদালত প্রাঙ্গণে তার বাবা-মাকে মেয়ের এমন সিদ্ধান্তে বিষণ্ণ ও নীরব থাকতে দেখা যায়।

আমি জান্নাতুল ফেরদৌস। আমার বর্তমান নাম জান্নাতুল ফেরদৌস। পূর্ব নাম বৈশাখী রানী পাল। ইসলামের প্রতি ভালো লাগা থেকেই আমি ইসলাম নিয়ে ইন্টারমিডিয়েট থেকে পড়াশোনা ও জানার চেষ্টা শুরু করি। পরে বিভিন্নভাবে জানার পর বুঝতে পারি যে, সত্য ধর্ম হচ্ছে একমাত্র আল্লাহর কাছে মনোনীত ধর্ম ইসলাম। এরপর আমি সত্যকে গ্রহণ করি এবং স্বেচ্ছায় এ ধর্মে আসি। এখানে কারও প্ররোচনা ছিল না কিংবা কোনো প্রেমঘটিত বিষয়ও ছিল না। একান্তই আমি সত্যের সন্ধানে এখানে এসেছি।

আমার বাড়ি হাইমচর। আমি চাঁদপুর সরকারি কলেজের গণিত বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্রী। আমার বাবার নাম কালীপদ পাল এবং মায়ের নাম উজ্জ্বলা রানী পাল। ইসলাম কখনো পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা বলে না। আমি তাদের সঙ্গে কখনোই সম্পর্ক ছিন্ন করতে চাই না। তারা আমার পরিবার ছিল, আছে এবং আজীবন থাকবে। আমি যতদিন বেঁচে আছি, তারা যদি আমার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে চায়, সেটা তাদের সিদ্ধান্ত হতে পারে। কিন্তু আমার পক্ষ থেকে আমি সবসময় তাদের পরিবার হিসেবেই মেনে এসেছি এবং মেনে যাব।

আমি সবসময়ই তাদের পাশে থাকতে চাই। তবে তারা আমাকে মেনে নেবে কি না, সেটা তাদের বিষয়। আমি এখনো স্বাবলম্বী নই, তবে আমি নিজ জিম্মায় থাকতে চাই। আগে যেমন হলে থাকতাম, এখনো হলে আছি। আমি টিউশন করাই। আমি প্রাপ্তবয়স্ক এবং আমার সিদ্ধান্ত আমি নিজেই নিয়েছি। আমার পরিবারের সংস্কৃতি এবং আমার বর্তমান ধর্মীয় জীবনধারা আলাদা হওয়ায় সেখানে আমার ধর্মীয় নিয়ম ঠিকভাবে পালন করা সম্ভব হবে না।

ইসলাম ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট না হওয়ার কোনো সুযোগ নেই, কারণ এটিই সত্য ধর্ম। কেউ যদি সত্যের সন্ধান করে, তবে আল্লাহ নিজেই চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন—এটাই সত্য। যদি কেউ সত্যসন্ধানী হয়, তবে তাকে সত্যকে গ্রহণ করতেই হবে। আর যদি কেউ সমাজ বা পরিবারের ভয়ে সত্যকে গ্রহণ না করে, তবে সে প্রকৃত সত্যসন্ধানী নয়। সবার উদ্দেশ্যে আমি বলব—আপনারা যেখানেই থাকুন, সত্যের সন্ধান করুন। নিজের অবস্থান সঠিক কি না, তা নিজ জায়গা থেকেই যাচাই-বাছাই করা উচিত।

স্থানীয়দের কেউ কেউ জানান, মেয়েটি স্বেচ্ছায় হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে বলে তারা শুনেছেন। এমনকি তার পরিবার যদি এখন তাকে গ্রহণ না-ও করে, তবে এলাকাবাসী হিসেবে তাকে সহযোগিতা করবেন বলেও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

যেহেতু সে প্রাপ্তবয়স্ক, তাই নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো বয়স তার হয়েছে। আমরা আশাবাদী যে আদালত তার সিদ্ধান্তকে গুরুত্ব দিয়ে তাকে নিজের মতো করে জীবনযাপন করার সুযোগ দেবেন।

যেহেতু সে প্রাপ্তবয়স্ক, আমরা আশা করি বিচারক তাকে তার নিজের জিম্মায় থাকার সুযোগ দেবেন। সে স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছে এবং ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী জীবনযাপন করতে পারবে—এই আশা ব্যক্ত করা হচ্ছে।

এদিকে জান্নাতুল ফেরদৌসকে সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয়। সেখানে ফৌজদারি কার্যবিধির ২২ ধারা অনুযায়ী তার জবানবন্দি নেওয়া হয়। আদালত তার বক্তব্য শুনে অবশেষে তাকে নিজ জিম্মায় থাকার নির্দেশ দেন।

Source: ফাতিমা সুলতানা, এটিএন বাংলা।

*

إرسال تعليق (0)
أحدث أقدم