![]() |
| ইরান যুদ্ধ নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন প্রশ্ন—সমর্থন দিলেও কেন সরাসরি যুদ্ধে নামছে না চীন ও রাশিয়া? |
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলাকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনার মধ্যে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—কেন ইরানের পাশে সরাসরি দাঁড়াচ্ছে না চীন ও রাশিয়া? মুখে সমর্থন ও কূটনৈতিক প্রতিবাদ থাকলেও সামরিকভাবে এখনো দূরত্ব বজায় রেখেছে এই দুই শক্তিধর দেশ। এর পেছনে রয়েছে কূটনৈতিক সম্পর্কের ধরন, চুক্তির শর্ত এবং বড় অর্থনৈতিক স্বার্থের হিসাব।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের আকস্মিক যৌথ হামলায় ইরান এখন পর্যন্ত হারিয়েছে তাদের ১০০০-এরও বেশি সামরিক ও বেসামরিক নাগরিক। হারিয়েছে তাদের প্রাণপ্রিয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনীকেও। সেই সঙ্গে হারিয়েছে অর্ধশতাধিক ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাকে। এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় প্রতিনিয়ত নাস্তানাবুদ হচ্ছে ইরান।
স্বজাতি হয়েও ইরানের পাশে নেই কোনো মুসলিম দেশ। এ অবস্থায় বিশ্বের লাখো কোটি ইরান-সমর্থকদের মনে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। তাদের প্রশ্ন—সমর্থক হয়েও চীন ও রাশিয়া কেন শুধু নিন্দা আর প্রতিবাদে সরব হয়ে আছে? ইরানের পক্ষ হয়ে কেন যুদ্ধে শরিক হচ্ছে না এই দুটি দেশ?
এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে দুটি কূটনৈতিক ও আইনি শব্দের মধ্যে। এর একটি শব্দ ‘অংশীদার’, আরেকটি ‘মিত্র’। বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন এবং রাশিয়া সরাসরি ইরানের পক্ষ হয়ে সামরিক হস্তক্ষেপ করছে না, কারণ এই দুটি দেশ ইরানের কৌশলগত অংশীদার—মিত্র নয়।
কোনো দেশের মিত্র আরেক মিত্র দেশের জন্য যা করতে পারে, কৌশলগত অংশীদার তা পারে না। যেমন—মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের মিত্র দেশ হওয়ায় ইসরাইলের হয়ে নিজেদের সেনাবাহিনী ও অস্ত্র দিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নিয়েছে আমেরিকা। কিন্তু শুধু কৌশলগত অংশীদার হওয়ায় সরাসরি ইরানের পক্ষ নিয়ে যুদ্ধ করতে পারছে না চীন ও রাশিয়া।
বিষয়টি আরও একটু ব্যাখ্যা করা যাক। গেল বছরের ১৭ জানুয়ারি ইরানের সঙ্গে রাশিয়া একটি চুক্তি সম্পন্ন করে, যার নাম ‘কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি’। সেই চুক্তি অনুযায়ী হামলার সময় রাশিয়ার ভূমিকা কেবল পরামর্শ প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আইনিভাবে শুধুমাত্র অংশীদার হওয়ায় রাশিয়া ইরানকে কেবল সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করতে পারবে, সৈন্য নয়। বিশ্লেষকদের ভাষ্যমতে, এটি কেবল সমর্থন দেখানোর একটি প্রদর্শন।
আর তাই ইরানের সঙ্গে রাশিয়ার চুক্তি অনুযায়ী ইরানের পক্ষ হয়ে যুদ্ধে নামতে রাশিয়া বাধ্য নয়। কেবল অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করতে পারে এবং মৌখিকভাবে নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাতে পারে—এর বেশি কিছু নয়।
চীনের সঙ্গেও ইরানের ২৫ বছরের একটি বড় সহযোগিতামূলক চুক্তি রয়েছে। ৪০০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্যিক স্বার্থ সংশ্লিষ্ট এই চুক্তিটি স্বাক্ষর হয় ২০২১ সালে। চুক্তি অনুযায়ী চীন ইরানকে একটি ব্যাপক কৌশলগত অংশীদার হিসেবে গণ্য করে। আর বেইজিংয়ের কূটনৈতিক অভিধানে ‘ব্যাপক কৌশলগত অংশীদার’-এর অর্থ হলো মূলত বাণিজ্যিক সহযোগিতা সমন্বয় করা।
চীনের সঙ্গে ইরানের এই চুক্তি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, তেহরানের সাধারণ মানুষ ধারণা করেছিল এই চুক্তি ইরানের শাসনব্যবস্থাকে শক্তিশালী করবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই চুক্তির বিনিময়ে বেইজিং তেহরানের বাজারে সস্তা পণ্য প্রবেশ করাবে। আর তাতে ইরানের চেয়ে চীনই বেশি লাভবান হবে।
ফলে চীনের সঙ্গে ইরানের যে চুক্তি রয়েছে, তাতে আক্রান্ত হলে সামরিক সহায়তার কোনো ধারা নেই। আর তাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে মুখে প্রতিবাদ জানালেও ইরানের হয়ে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই চীনের।
এছাড়া গেল ২৯ জানুয়ারি চীন, রাশিয়া ও ইরান একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি করে। এর লক্ষ্য ছিল কারও একতরফা জবরদস্তি প্রত্যাখ্যানের একটি রূপরেখা তৈরি করা। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই চুক্তিটিও মূলত নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর একটি ব্যবস্থা। ন্যাটোর মতো কোনো যুদ্ধকালীন জোট গঠনের জন্য নয়।
ন্যাটোর আর্টিকেল পাঁচ অনুযায়ী সদস্যভুক্ত কোনো দেশ আক্রান্ত হলে অন্য সদস্যরা তাদের হয়ে লড়াই করে—যা প্রকৃত মিত্র দেশের একটি উদাহরণ। কিন্তু তেহরানের সঙ্গে বেইজিং কিংবা মস্কোর সম্পর্ক চুক্তির দিক থেকে তেমন নয়। কারণ এই দুটি দেশ ইরানের কেবলমাত্র কৌশলগত অংশীদার, কৌশলগত অভিভাবক বা মিত্র নয়।
শুধু চুক্তির কারণেই নয়, নিজেদের বাণিজ্যের কথা ভেবেও ইরানের পক্ষে যুদ্ধে নামার সিদ্ধান্ত নেবে না চীন ও রাশিয়া। কারণ চীন ইরানের কাছ থেকে প্রতিদিন গড়ে ১.৩৮ মিলিয়ন ব্যারেল তেল আমদানি করে। অপরদিকে রাশিয়া ইরানের ড্রোনের অন্যতম বড় ক্রেতা।
এই দুটি দেশ মনে করছে, এই অঞ্চলের দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা মানে তাদের এই বাজার বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং তাদের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়া। ইরানের জন্য আমেরিকার সঙ্গে এই মুহূর্তে কোনো সংঘাতে জড়াতে চাইছে না চীন ও রাশিয়া।
এমন বাস্তবতায় নিজেদের অধিকার রক্ষা কিংবা প্রতিশোধের মিশনে কাউকেই পাশে পাচ্ছে না ইরান। চুক্তির অজুহাতে ইহুদি দেশ আর মুসলিম দেশগুলো সরে আছে নিজেদের স্বার্থ এবং মার্কিন আজ্ঞাবহ নীতির নির্লজ্জ প্রকাশে।
Source: হাবিব রাসেল এনটিভি অনলাইন
